Tuesday, October 30, 2018

ওমর খৈয়াম - অজানা ইতিহাসের ডায়েরী থেকে

ওমর খৈয়াম - অজানা ইতিহাসের ডায়েরী থেকে

 

অনেক ইতিহাসবিদের মতে সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর কিছু আগে ওমর খৈয়ামের জন্মগ্রহণ করেন। ওমর খৈয়ামের শৈশবের কিছু সময় কেটেছে অধুনা আফগানিস্তানে বালক শহরে। সেখানে তিনি খোরাসানের অন্যতম সেরা চিকিৎসক হিসেবে বিবেচিত ইমাম নিশাপুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।  

দিনের বেলায় জ্যামিতি ও বীজগণিত পড়ানো , সন্ধ্যায় মালিক দরবারে পরামর্শ প্রদান এবং রাতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি জালালী বর্ষপঞ্জি সংশোধন সবটাতে তার কোন কমতি ছিল না । জীবদ্দশায় ওমরের খ্যাতি ছিল গণিতবিদ হিসেবে নিজের গবেষণা জীবন শুরু করেন খৈয়াম।  

প্রথমেই তিনি অনুধাবন করেন প্রচলিত পদ্ধতিতে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান সম্ভব নয়।  তাই নতুন পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তিনি প্রথম উপবৃত্ত ও বৃত্তের সাধকের সাহায্যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন । ওমরের আরেকটি বড় অবদান ইউক্লিডের সমানতরাল স্বীকার্যের সমালোচনা । 

যা পরবর্তী সময়ে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সূচনা করে 1070 খ্রিস্টাব্দে তাঁর পুস্তক মাকালাত পিয়া আলবেলা প্রকাশিত হয়।  এই পুস্তকে তিনি গাঁথি হিসেবে সমীকরণের শ্রেণীকরণ করেন এবং দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান এর নিয়মাবলী লিপিবদ্ধ করেন। ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিদ হিসেবে সমধিক পরিচিত।

ইবনে সিনা || ইতিহাসের পাতা থেকে




আবু আলি ইবনে সিনা
[খ্রীঃ ৯৮০-১০৩৭]

আবু-ইবন সিনা মধ্যযুগের এক বড় বিস্ময়। তাঁর পুরো নাম আবু আলি হোসেন ইবন আবদাল্লা হাসান আলি সিনা। সংক্ষেপে বলা হয় ইবন সিনা বা আবিসেনা। 980 খ্রিস্টাব্দে বোখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন । বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী দার্শনিক আবু আলী সিনা ।

বোখারা শহরটি সেই সময় ছিল ইরানের অন্তর্ভুক্ত।  ইবনে সিনা দর্শন বিজ্ঞান জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে যুক্তিবিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান, অংক ইত্যাদি চর্চা করেছেন ।

তিনি মাত্র 16 ষোল বছর বয়সে সমকালীন জ্ঞানী-গুণী চিকিৎসক ও মনীষীদের পড়িয়েছেন । ফলে সহজেই বোঝা যায় তিনি ছিলেন সেই সময়কার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক ।  

কথিত আছে,  ইবনে সিনা যখন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো তার মানসপটে স্বপ্নের মত ভাসতো, তার জ্ঞানের দরজা খুলে যেত । 

 ঘুম থেকে উঠে তিনি সমস্যার সমাধান করে ফেলতেন একজন বিখ্যাত চিকিৎসক হিসেবে সর্বত্র তার নাম ছড়িয়ে পড়ে । 

মাত্র 21 একুশ বছর বয়সে তিনি আল মজমুয়া নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন।  এর মধ্যে গণিত ছাড়া সব বিষয় লিপিবদ্ধ করেন ।  

ইবনে সিনা পদার্থ বিজ্ঞান দর্শন ধর্ম তত্ত্ব জ্যামিতি গণিত বিজ্ঞান সাহিত্য প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।  তিনি তার সময়ে পৃথিবীর সেরা চিকিৎসক।

Friday, October 26, 2018

বিয়ে করার ৪টি শর্ত ফরয করে........


মুসলমানদের ওপর আল্লাহ তায়ালা বিয়ে ফরয করে দিয়েছেনকিন্তু বিয়ে ফরয হলেও ৪টি শর্ত পূরণ না করলে সেই বিয়েকে আল্লাহ তায়ালা কখনোই বিশুদ্ধ বিয়ে বলে মেনে নেবে নাতাই সেই ৪টি শর্ত সম্পর্কে এখনই চলুন জেনে নিই
(১) ইশারা করে দেখিয়ে দেয়া কিংবা নাম উল্লেখ করে সনাক্ত করা অথবা গুণাবলী উল্লেখ অথবা অন্য কোন মাধ্যমে বর-কনে উভয়কে সুনির্দিষ্ট করে নেয়া

(২) বর-কনে প্রত্যেকে একে অপরের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়াএর দলীল হচ্ছে নবি (সাঃ) বাণীনবীজী (সা.) বলেছেন  স্বামীহারা নারী (বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্ত) কে তার সিদ্ধান্ত জানা ছাড়া (অর্থাৎ সিদ্ধান্ত তার কাছ থেকে চাওয়া হবে এবং তাকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে) বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকে তার সম্মতি ছাড়া (কথার মাধ্যমে অথবা চুপ থাকার মাধ্যমে) বিয়ে দেয়া যাবে নালোকেরা জিজ্ঞেস করল, ইয়া রসুলুল্লাহ (স.)! কেমন করে তার সম্মতি জানবো (যেহেতু সে লজ্জা করবে)তিনি বললেন, চুপ করে থাকাটাই তার সম্মতি” [সহীহ বুখারী, (৪৭৪১)
(৩) বিয়ের আকদ (চুক্তি) করানোর দায়িত্ব মেয়ের অভিভাবককে পালন করতে হবেযেহেতু আল্লাহ তায়ালা বিয়ে দেয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশনা জারী করেছেন
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা তোমাদের মধ্যে অবিবাহিত নারী-পুরুষদের বিবাহ দাও” [সূরা নূর, ২৪:৩২]

 নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল” [হাদিসটি তিরমিযি (১০২১) ও অন্যান্য গ্রন্থকার কর্তৃক সংকলিত এবং হাদিসটি সহীহ]
(৪) বিয়ের আকদের সময় সাক্ষী রাখতে হবে দলীল হচ্ছে- নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“অভিভাবক ও দুইজন সাক্ষী ছাড়া কোন বিবাহ নেই” [তাবারানী কর্তৃক সংকলিত, সহীহ জামে (৭৫৫৮)
বিয়ের প্রচারণা নিশ্চিত করতে হবে সম্পর্কে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“তোমরা বিয়ের বিষয়টি ঘোষণা কর” [মুসনাদে আহমাদ এবং সহীহ জামে গ্রন্থে হাদিসটিকে হাসানবলা হয়েছে (১০৭২)

আল ফারাবি

আল ফারাবি (ফার্সি: ابونصر محمد بن محمد فارابی‎‎, আবু নসর মুহম্মদ বিন মুহম্মদ আল ফারাবি, একজন প্রখ্যাত মুসলিম দার্শনিক বিজ্ঞানী


এছাড়াও তিনি একজন মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ, যুক্তিবিদ এবং সুরকার ছিলেনপদার্থ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে তার অবদান উল্লেখযোগ্যপদার্থ বিজ্ঞানে তিনিই 'শূন্যতা'-র অবস্থান প্রমাণ করেছিলেনতিনি ৮৭২, মতান্তরে ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিস্তানের অন্তর্গত 'ফারাব' নামক শহরের নিকটবর্তী 'আল ওয়াসিজ' নামক গ্রামে জন্মগ্রহন করেনতিনি ৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন
 

অবদান

আল ফারাবী দর্শন ছাড়াও যুক্তিবিদ্যা সঙ্গীত-এর ন্যায় জ্ঞানের বিস্তর শাখায় অবদান রাখেন আল মদিনা আল ফাজিলা বা আদর্শ নগর তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ কিতাব আল মুসিকি আল কবির বা সঙ্গীতের মহান গ্রন্থ তার আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ

দর্শন

প্লেটো এরিস্টটলএর দর্শনের উপর তিনি বিস্তর আলোচনা করেছেন প্লেটোর রিপাবলিক-এর মত তিনিও একটি আদর্শ রাষ্ট্র-এর কল্পনা করেছেন তার আদর্শ নগর গ্রন্থেতিনি স্রষ্টার সর্বাধিপত্য স্বীকারের পাশাপাশি সৃষ্টিকেও শাশ্বত বলে মনে করতেনতিনি কোন চরম মত পোষণ করতেন না এবং চিন্তার ক্ষেত্রে পরস্পর-বিরোধী মতকে প্রায়শই একসাথে মিলাবার চেষ্টা করেছেন

রাষ্ট্র দর্শন

আদর্শ নগর-এ তার রাষ্ট্রনায়ক-এর একনায়ক বৈশিষ্ট প্রকটতার মতে রাষ্ট্রের প্রধান রাষ্ট্রের সর্বৈব ক্ষমতা পোষণ করবেন এবং অন্য সবাই তার বাধ্য থাকবেন নাগরিকদের ক্ষমতায়ও থাকবে শ্রেণি বিভাজন, যেখানে কোনো শ্রেণী তার উপরের শ্রেণীর আদেশ মান্য করবে ও নিচের শ্রেণীর উপর আদেশ জারী করবেতৎকালীন বহুধাবিভক্ত সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় আনতে এই রাষ্ট্র দর্শন প্রভাব বিস্তার করে এবং সময়ের বিচারে এরূপ ভাবধারা গুরুত্বপূর্ণ ছিলআদর্শ রাষ্ট্রকে তিনি অসম্ভব উল্লেখ করলেও এটি অর্জনের জন্য মানুষের চিরন্তন প্রচেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন
উপাধি
দ্বিতীয় শিক্ষক
জন্ম
সি. ৮৭২
খোরাসানে ফারিয়ব শহরের নিকটবর্তী আল ওয়াসিজ নামক গ্রামে
মৃত্যু
৯৫৬ খ্রিঃ
দামেস্ক
জাতিভুক্ত
পার্সিয়ান/তুর্কি
যুগ
ইসলামী স্বর্ণযুগ
মূল আগ্রহ
অধিবিদ্যা, রাজনৈতিক দর্শন, যুক্তি, সঙ্গীত, বিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র, মিস্টিসিজম,[২] জ্ঞানতত্ত্ব
লক্ষণীয় কাজ
কিতাব আল-মুসিকি আল-কাবির ("সঙ্গীতের মহান বই"), আরা আহল আল-মাদিনা আল-ফাদিলা ("পবিত্র শহর"), কিতাব ঈসা আল-উলুম ("জ্ঞানের পরিচিতি"), কিতাব ঈসা আল-ইকাআত ("ছন্দের শ্রেণীবিভাগ"


প্রভাবিত হয়েছেন-  এরিস্টটল, প্লেটো, ফরফিরি, টলেমি, আল-কিন্দি দ্বারা।

Thursday, October 25, 2018

ইখলাছ মানে কি? ইখলাছ সম্পর্কে আলোচনা ।




ইখলাছ 
মূল (আরবি) : মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদ : আব্দুল মালেক
সঊদী আরবের প্রখ্যাত আলেম ও দা-ই-
ঝিনাইদহ
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালকদয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক নবি ও রাসূলকুলের শ্রেষ্ঠজন আমাদের নবি মুহাম্মাদ (স.), তাঁর পরিবারবর্গ ও ছাহাবীদের সকলের প্রতি
অতঃপর মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমার পক্ষে অন্তরের আমল সমূহ (أعمال القلوب) বিষয়ে বারটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রাখার সুযোগ হয়েছিলএই আলোচনাগুলো তৈরীতে যাদ গ্রুপের একদল চৌকস জ্ঞানী-গুণী আমাকে সহযোগিতা করেছেআজ তা ছাপার অক্ষরে বের হতে যাচ্ছে
অন্তরের এই আমল সমূহের প্রথমেই রয়েছে ইখলাছইখলাছই সকল ইবাদতের সার ও প্রাণকোন ইবাদত কবুল হওয়া না হওয়া ইখলাছের উপর নির্ভর করেএটি অন্তরের আমল সমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবার উপরে এবং সকলের মূলভিত্তি যুগে যুগে আগত নবি-রাসূলদের দাওয়াতের চাবিকাঠি ছিল ইখলাছযেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَا أُمِرُوْا إِلاَّ لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَاءَঅথচ তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খালেছ অন্তরে একনিষ্ঠভাবে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে’ (বাইয়েনাহ ৯৮/৫)তিনি আরও বলেন,أَلاَ لِلَّهِ الدِّيْنُ الْخَالِصُ، সাবধান, খালেছ দ্বীন বা ইবাদত কেবল আল্লাহর’ (সূরা যুমার ৩৯/৩)
আমাদের নিয়ত খালেছ হোক, আমাদের মন পাপের কালিমা মুক্ত হোক এবং আমাদের আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হোক মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের এটাই বিনীত প্রার্থনানিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও দোআ কবুলকারী
আভিধানিক অর্থে ইখলাছ :
ইখলাছ শব্দটি আরবি أَخْلَصَ ক্রিয়া থেকে গঠিতএর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়াবাচক শব্দ يُخْلِصُ এবং মাছদার বা ক্রিয়ামূল إخْلاَصًاযার অর্থ কোন জিনিস পরিশুদ্ধ করা, অন্য কোন কিছুর সাথে তাকে না মেশানোআরবিতে أَخْلَصَ الرَّجُلُ دِيْنَهُ لِلّهِ অর্থাৎ লোকটি তার দ্বীনকে শুধুই আল্লাহর জন্য নির্ভেজাল করেছে; তার দ্বীনের মধ্যে আল্লাহর সাথে আর কাউকে মেশায়নি
আল্লাহ বলেন, إِلاَّ عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِيْنَ  তবে তাদের মধ্য থেকে তোমার নির্বাচিত বান্দারা ব্যতীত ( সূরা হিজর ১৫/৪০)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ছালাব (রহঃ) বলেছেন, আল-মুখলিছীন তারাই যারা নির্ভেজালভাবে আল্লাহর জন্য ইবাদত
করেআর আল-মুখলাছীন তারা, যাদেরকে আল্লাহ খালেছ, নির্ভেজাল ও নিষ্কলুষ করেছেন
আল্লাহর বাণী , وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخْلَصًا  তুমি এই কিতাবে মূসার বৃত্তান্ত বর্ণনা করনিশ্চয়ই সে ছিল নির্বাচিত’ (সূরা মারিয়াম ১৯/৫১)এখানে মুখলাছশব্দ সম্পর্কে যুজাহ বলেছেন, মুখলাছ সেই, যাকে আল্লাহ খালেছ করেছেন; সকল আবিলতা বা পাপ থেকে তাকে মুক্ত করেছেনআর মুখলিছ সেই, যে নিরেট নির্ভেজালভাবে আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহীদে বিশ্বাসীএজন্য (قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ) সূরাকে সূরাতুল ইখলাছ বলা হয়
ইবনুল আছীর (রহঃ) বলেছেন, এই সূরা ইখলাছে নির্ভেজালভাবে কেবলই মহামহিম আল্লাহর গুণ বর্ণিত হয়েছেতাই সূরাটির নাম হয়েছে ইখলাছঅথবা এই সূরাটি পড়ে সে খালেছ বা নির্ভেজালভাবে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয় বলে সূরাটির নাম ইখলাছকালেমায়ে তাওহীদকে এজন্য কালেমায়ে ইখলাছও বলা হয়
আবার খালেছ জিনিস (الشيئ الخالص) বলতে,الصّافِي الَّذِيْ زَالَ عَنْهُ شَوْبُه الَّذِيْ كانَ فِيْهখাঁটি জিনিসকে বুঝায়, যার থেকে সব রকম মিশ্রণ দূরীভূত করা হয়েছে। [1] আল্লামা ফীরোযাবাদী (রহঃ) বলেছেন, أَخْلَصَ لِلَّهِ: تَرَكَ الرِّياءَ অলৌকিকতা বর্জন করে কোন কাজ আল্লাহর জন্য করা।[2] জুরজানী (রহঃ) বলেছেন, الإخلاص في اللغة ترك الرياء في الطاعات আভিধানিক অর্থে ইখলাছ হল, সৎকাজে লৌকিকতা পরিহার করা। [3]
পারিভাষিক অর্থে ইখলাছ :
আলেমগণ ইখলাছের বেশ কয়েকটি সংজ্ঞা দিয়েছেনতন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংজ্ঞা নিম্নে প্রদত্ত হল :
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন,الإخلاص : هو إفراد الحق سبحانه بالقصد في الطاعة- ‘স্বেচ্ছায় একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত নিবেদনকে ইখলাছ বলে।[4] জুরজানী (রহঃ) বলেছেন, ‘অন্তরকে পরিস্কার করার জন্য সকল দূষিত পদার্থের মিশ্রণ থেকে মুক্ত করাবিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- প্রত্যেক বস্ত্তর সাথেই কোন না কোন কিছু মিশে আছে বলে ধারণা করা হয়সুতরাং যখন তা মিশ্রণ থেকে পরিস্কার ও মুক্ত হয় তখন তাকে খালেছবা খাঁটি বলে আবার পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত কাজকে বলে ইখলাছআল্লাহ বলেছেন, نُسْقِيكُمْ مِمَّا فِيْ بُطُوْنِهِ مِنْ بَيْنِ فَرْثٍ وَدَمٍ لَبَنًا خَالِصًا سَائِغًا لِلشَّارِبِيْنَ- আমরা তোমাদেরকে তাদের থেকে বিশুদ্ধ দুধ পান করাই, যা পানকারীদের জন্য অতীব উপাদেয়যা নিঃসৃত হয় উক্ত পশুর উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হতে’ (নাহল ১৬/৬৬)এখানে দুধের নির্ভেজালতা বা পিওরিটি অর্থ- তাতে গোবর ও রক্তের মিশ্রণ না থাকা।[5] কেউ কেউ বলেছেন,الإخلاص تصفية الأعمال من الكدورات، আমল বা কাজকে দূষণমুক্ত করাই ইখলাছ।[6]
হুযায়ফা আল-মারআশী (রহঃ) বলেছেন,الإخلاص استواء أفعال العبد في الظاهر والباطن- ‘বান্দার কাজ ভেতর-বাহির থেকে এক রকম হওয়াকে ইখলাছ বলে।[7] কেউ কেউ বলেছেন, الإخلاص أن لا تطلب على عملك شاهدا غير الله ولا مجازيا سواه- ‘নিজের আমলের উপর আল্লাহ ছাড়া কাউকে সাক্ষী এবং প্রতিদানদাতা হিসাবে না মানার নাম ইখলাছ।[8]
সালাফে ছালেহীন থেকে ইখলাছের আরো কিছু অর্থ বর্ণিত হয়েছেযেমন-
(১) আমল শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হবে, তাতে আল্লাহ ছাড়া অন্যের কোন অংশ থাকবে না। (২) সৃষ্টিকুলের মনঃস্ত্তষ্টি সাধন থেকে আমলকে মুক্ত করা। (৩) সবরকম কলুষ-কালিমা থেকে আমলকে মুক্ত রাখা।[9]
আর মুখলেছ সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্ক তৈরী হওয়ার কারণে জনগণের অন্তরে তার প্রতি যত রকম শ্রদ্ধা-ভক্তি জন্মে সে তার কোন পরোয়া করে না এবং তার আমলের বিন্দু-বিসর্গও মানুষ টের পাক তা সে পসন্দ করে নাশরীআতে যেমন তেমনি মানুষের কথাতেও বহু ক্ষেত্রে ইখলাছের স্থলে নিয়ত শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়ফকীহদের মতে নিয়ত হল ইবাদতকে অভ্যাস থেকে এবং এক ইবাদতকে অন্য ইবাদত থেকে পৃথক করা।[10] ইবাদতকে অভ্যাস থেকে আলাদা করার উদাহরণ যেমন দেহ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য গোসল একটি অভ্যাসমূলক আমলঅপরদিকে জানাবাত বা দৈহিক অপবিত্রতা জনিত গোসল ইবাদতমূলক আমলএখানে জানাবাতের গোসলের নিয়ত করলে তা অভ্যাসমূলক গোসল থেকে পৃথক হয়ে যাবে
আবার এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদত পৃথক করার উদাহরণ যেমন, যোহর ছালাত থেকে আছর ছালাত পৃথক করাউক্ত সংজ্ঞানুসারে নিয়ত ইখলাছের অন্তর্ভুক্ত নয়কিন্তু যখন শর্তহীন ভাবে নিয়ত শব্দ উল্লেখ করা হবে এবং তা দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত ইবাদতকে পৃথক করা বুঝাবে যেমন ইবাদত কি অংশীদারমুক্ত এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে নাকি অন্যের উদ্দেশ্যে- তখন অবশ্য নিয়ত ইখলাছের অর্থে আসবে
ইবাদতে ইখলাছ আর ইবাদতে সত্য উভয়ই কাছাকাছি অর্থবোধকঅবশ্য উভয়ের মধ্যে কিছু তফাৎও রয়েছেপ্রথম পার্থক্য : সত্য মূল এবং ইখলাছ তার শাখা ও অনুগামীদ্বিতীয় পার্থক্য : কাজে মশগূল না হওয়া পর্যন্ত ইখলাছ আছে কি-না তা বুঝা যায় নাকিন্তু কাজে নামার আগেও কখনো কখনো সত্য উদ্ভাসিত হয়।[11]
ইখলাছ অবলম্বনের আদেশ
ইখলাছ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী :
আল্লাহ তাঁর গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে তাঁর বান্দাদেরকে ইখলাছ অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেনযেমন তিনি বলেন, وَمَا أُمِرُوْا إِلاَّ لِيَعْبُدُوْا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَاءَ، অথচ তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খালেছ অন্তরে একনিষ্ঠভাবে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে (বাইয়েনাহ ৯৮/৫)
নবি করীম (স.) নিজে যে ইখলাছের সাথে আল্লাহর ইবাদত করে থাকেন সে কথা মানুষকে জানিয়ে দিতে তিনি তাঁকে আদেশ দিয়েছেনএ মর্মে তিনি বলেন,قُلِ اللهَ أَعْبُدُ مُخْلِصًا لَهُ دِيْنِيْ- ‘বল, আমি আল্লাহর ইবাদত করি তাঁর জন্য আমার আনুগত্যকে একনিষ্ঠ করার মাধ্যমে’ (যুমার ৩৯/১৪)
তিনি আরো বলেন,قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ- لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ- ‘বল, আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ, সবই বিশ্বপালক আল্লাহর জন্যতাঁর কোন শরীক নেইআর এ ব্যাপারেই (অর্থাৎ শরীক না করার ব্যাপারে) আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম’ (আনআম ৬/১৬২-১৬৩)
আল্লাহ নিজে জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, মানুষের মাঝে কে অধিকতর ভাল কাজ করে তা দেখার জন্যতিনি বলেছেন, الَّذِيْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً وَهُوَ الْعَزِيْزُ الْغَفُوْرُ- ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য, কে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সুন্দর আমল করেআর তিনি মহা পরাক্রান্ত ও ক্ষমাশীল’ (সূরা মুল ৬৭/২)
ফুযায়েল বিন ইয়ায (রহঃ) সুন্দর আমল সম্পর্কে বলেছেন, সুন্দর আমল তাই যা অধিকমাত্রায় ইখলাছপূর্ণ এবং অধিকমাত্রায় সঠিকলোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবু আলী! অধিকমাত্রায় ইখলাছপূর্ণ এবং অধিকমাত্রায় সঠিক আমল কী? তিনি বললেন, আমল ইখলাছপূর্ণ হলেও যদি সঠিক নিয়মে না হয়, তবে তা কবুল হবে না; আবার সঠিক নিয়মে হলেও যদি ইখলাছপূর্ণ না হয় তবে তাও কবুল হবে নাইখলাছপূর্ণ ও সঠিক হলেই কেবল তা কবুল হবেযা আল্লাহর জন্য করা হয় তাই ইখলাছপূর্ণ এবং যা সুন্নাত অনুযায়ী হয় তাই সঠিক ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) তাঁর কথার সাথে যোগ করে বলেছেন, এ যেন ঠিক আল্লাহর বাণী,فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا- ‘অতএব যে ব্যক্তি তার প্রভুর সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’ (সূরা কাহফ ১৮/১১০)-এর প্রতিধ্বনি।[12] কবি আমীর ছানআনী বলেছেন, তোমার জীবনের সময়গুলো কেটে গেছে আল্লাহর আনুগত্য ছাড়াতুমিতো তোমার মনপসন্দ কাজে বিভোর ছিলে- যা কিনা শুধুই মরীচিকাযখন তোমার কাজ শুধুই আল্লাহর জন্য না হবে তখন যত কিছুই তুমি বানাও না কেন তা সবই বরবাদ হবেআমল কবুলের জন্য ইখলাছ থাকা শর্ত, সে সঙ্গে তা হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহ মাফিক
মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ইহসানের পথে নিবেদিত আমলকে সর্বোত্তম দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা বলে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন,وَمَنْ أَحْسَنُ دِيْنًا مِمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ، তার চাইতে উত্তম দ্বীন কার আছে, যে তার চেহারাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে ও সৎকর্ম করেছে’ (সূরা নিসা ৪/১২৫)আল্লাহর কাছে সমর্পণ হল ইখলাছ আর ইহসান বজায় রাখা অর্থ সুন্নাতের অনুসরণ
আল্লাহ তাঁর নবিকে এবং সেই সাথে তাঁর উম্মতকে মুখলেছ বান্দাদের সাথে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেনতিনি বলেন, وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَهُ،আর তুমি নিজেকে ধরে রাখো তাদের সাথে যারা সকালে ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে আহবান করে তাঁর চেহারা কামনায়’ (সূরা কাহফ ১৮/২৮)
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করে তিনি তাদের সফল বলে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ বলেন,فَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِلَّذِيْنَ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَ اللهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ- ‘অতএব নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেএটা তাদের জন্য উত্তম, যারা আল্লাহর চেহারা কামনা করেআর তারাই হল সফলকাম’ (রূম ৩০/৩৮)
ইখলাছওয়ালাদের প্রতি আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট থাকার এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনতিনি বলেন,وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى- الَّذِيْ يُؤْتِيْ مَالَهُ يَتَزَكَّى- وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُجْزَى- إِلاَّ ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى-وَلَسَوْفَ يَرْضَى- ‘সত্বর এ থেকে দূরে রাখা হবে আল্লাহভীরু ব্যক্তিকেযে তার ধন-সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য এবং কারু জন্য তার নিকটে কোনরূপ অনুগ্রহ থাকে না যা প্রতিদান যোগ্যকেবলমাত্র তার মহান পালনকর্তার চেহারা অন্বেষণ ব্যতীতআর অবশ্যই সে অচিরেই সন্তোষ লাভ করবে’ (লায়েল ৯২/১৭-২১)
আল্লাহ জান্নাতবাসীদের গুণাবলী বলতে গিয়ে দুনিয়াতে তাদের ইখলাছ অবলম্বনের কথা বলেছেনআল্লাহ বলেন, إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لاَ نُرِيْدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلاَ شُكُوْرًا- ‘(এবং তারা বলে) শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমরা তোমাদের খাদ্য দান করে থাকি এবং তোমাদের নিকট থেকে আমরা কোন প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না’ (দাহর ৭৬/৯)তিনি ইখলাছ ওয়ালাদের পরকালে মহাপুরস্কার দানের ঘোষণা দিয়ে বলেন, لاَ خَيْرَ فِيْ كَثِيْرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلاَّ مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوْفٍ أَوْ إِصْلاَحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيْهِ أَجْرًا عَظِيْمًا- ‘তাদের অধিকাংশ শলা-পরামর্শে কোন মঙ্গল নেইকিন্তু যে পরামর্শে তারা মানুষকে ছাদাক্বা করার বা সৎকর্ম করার কিংবা লোকদের মধ্যে পরস্পরে সন্ধি করার উৎসাহ দেয় সেটা ব্যতীতযে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সেটা করে, সত্বর আমরা তাকে মহা পুরস্কার দান করব’ (সূরা নিসা ৪/১১৪)তিনি আরও বলেন,مَنْ كَانَ يُرِيْدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِيْ حَرْثِهِ وَمَنْ كَانَ يُرِيْدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيْبٍ- ‘যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে, আমরা তার ফসল বাড়িয়ে দেই আর যে ব্যক্তি ইহকালের ফসল কামনা করে, আমরা তাকে সেখান থেকে কিছু দিয়ে থাকিকিন্তু পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না’ (সূরা শূরা ৪২/২০)
ইখলাছ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স.)-এর বাণী :
নবি করীম (স.) ইখলাছের গুরুত্ব ও নিয়তে সততার কথা বর্ণনা করেছেনতিনি এ দুয়ের উপর সকল আমলের ভিত্তি রেখেছেনওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত রসূল (স.) বলেন, إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى،  নিশ্চয়ই প্রতিটি কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীলআর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পায়।[13] এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীছকেননা এতে শরীআতের এমন একটি মূলনীতি বিধৃত হয়েছে যার আওতায় সকল ইবাদত এসে পড়েকোন ইবাদতই তার থেকে বাদ যায় নাসুতরাং ছালাত, ছিয়াম, জিহাদ, হজ্জ, যাকাত, দান-ছাদাক্বা ইত্যাদি প্রত্যেক ইবাদত সৎ নিয়ত ও ইখলাছের মুখাপেক্ষীরসূল (স.) মানুষের জন্য শুধু এই মূলনীতি বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি বেশ কিছু আমলও উল্লেখ করেছেন এবং তাতে নিয়তের গুরুত্ব হেতু তা বিশুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেনএমন কিছু আমল নিম্নে তুলে ধরা হল-
তাওহীদ : রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেন,
 مَا قَالَ عَبْدٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ قَطُّ مُخْلِصًا إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ حَتَّى تُفْضِىَ إِلَى الْعَرْشِ مَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ-
যে ব্যক্তি একনিষ্ঠচিত্তে লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হবলবে, তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হবেএমনকি আরশ পর্যন্ত এর নেকী পৌঁছানো হবে; যদি সে কাবীরা গোনাহ সমূহ থেকে বিরত থাকে।[14]
মসজিদে যাওয়া : রসূলুল্লাহ (স.) বলেন,
 صَلاَةُ الرَّجُلِ فِى الْجَمَاعَةِ تُضَعَّفُ عَلَى صَلاَتِهِ فِىْ بَيْتِهِ وَفِىْ سُوقِهِ خَمْسًا وَعِشْرِيْنَ ضِعْفًا، وَذَلِكَ أَنَّهُ إِذَا تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الْمَسْجِدِ لاَ يُخْرِجُهُ إِلاَّ الصَّلاَةُ، لَمْ يَخْطُ خَطْوَةً إِلاَّ رُفِعَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَحُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيْئَةٌ، فَإِذَا صَلَّى لَمْ تَزَلِ الْمَلاَئِكَةُ تُصَلِّى عَلَيْهِ مَا دَامَ فِى مُصَلاَّهُ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَيْهِ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ. وَلاَ يَزَالُ أَحَدُكُمْ فِى صَلاَةٍ مَا انْتَظَرَ الصَّلاَةَ-
ব্যক্তির নিজ বাড়ীতে কিংবা বাজারে ছালাত আদায় অপেক্ষা জামাআতে ছালাত আদায়ে ২৫ গুণ বেশী ছওয়াব হয়কেননা সে যখন উত্তমরূপে ওযূ করে মসজিদ পানে বের হয় এবং ছালাত আদায় ব্যতীত তার অন্য কোন উদ্দেশ্য না থাকে তখন প্রতি পদক্ষেপে তার একটি পদমর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একটি গোনাহ বিদূরিত হয়তারপর যখন সে ছালাত শেষ করে তখন ছালাতের স্থানে তার অবস্থান করা অবধি ফেরেশতারা তার জন্য এই বলে দোআ করতে থাকে যে, হে আল্লাহ! তাকে তুমি শান্তি দাও এবং তাকে দয়া করআর তোমাদের কেউ যতক্ষণ (মসজিদে) জামাআতে ছালাতের অপেক্ষায় থাকে ততক্ষণ সে ছালাত আদায়ে রত বলে গণ্য হতে থাকে।[15]
ছিয়াম : রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ-
যে ব্যক্তি রামাযানে ঈমানের সাথে ও ছওয়াব লাভের আশায় ছিয়াম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গোনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।[] তিনি আরো বলেন,
مَنْ صَامَ يَوْمًا فِى سَبِيلِ اللهِ بَعَّدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا-
যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি ছিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন হতে সত্তর বছরের পথ দূরে রাখবেন।[17]
রাতের ছালাত : রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন,مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ- ‘যে ব্যক্তি রামাযানের রাত্রিতে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রাত্রির ছালাত আদায় করে, তার বিগত সকল গোনাহ মাফ করা হয়।[18]
ছাদাক্বা ও আল্লাহকে স্মরণ : আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (স.) এরশাদ করেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ تَعَالَى فِى ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِى عِبَادَةِ اللهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِى الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّى أَخَافُ اللهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ-
সাত শ্রেণি লোকদের আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তাঁর বিশেষ ছায়ার নিচে স্থান দিবেনযেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না১. ন্যায়পরায়ণ শাসক ২. ঐ যুবক যে তার প্রভুর আনুগত্যে যৌবনকে অতিবাহিত করেছে ৩. সেই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে লটকানো থাকে ৪. সেই দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ভালবাসে এবং তারা সেকারণে পরস্পরে মিলিত হয় এবং পরস্পর পৃথকও হয়৫. সেই ব্যক্তি যাকে কোন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী নারী (ব্যভিচারের জন্য) আহবান করে আর সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি ৬. সেই ব্যক্তি যে গোপনে এমনভাবে দান করে যে, তার ডান হাত কি দান করে তা বাম হাত জানে না৭. সেই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দুই চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করে।[19]
জিহাদ : রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন,مَنْ غَزَا فِى سَبِيلِ اللهِ وَلَمْ يَنْوِ إِلاَّ عِقَالاً فَلَهُ مَا نَوَى- ‘যে ইকাল (রশি) লাভের আশা ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে জিহাদ করে না তার জন্য তাই মিলবে যার সে নিয়ত করবে।[20]
জানাযায় অংশগ্রহণ : রসূল (স.) বলেন,مَنِ اتَّبَعَ جَنَازَةَ مُسْلِمٍ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا، وَكَانَ مَعَهُ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا، وَيَفْرُغَ مِنْ دَفْنِهَا، فَإِنَّهُ يَرْجِعُ مِنَ الأَجْرِ بِقِيرَاطَيْنِ، كُلُّ قِيرَاطٍ مِثْلُ أُحُدٍ، وَمَنْ صَلَّى عَلَيْهَا ثُمَّ رَجَعَ قَبْلَ أَنْ تُدْفَنَ فَإِنَّهُ يَرْجِعُ بِقِيرَاطٍ- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় কোন মুসলমানের জানাযার গমন করে এবং তার জানাযার লাত আদায় ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই ক্বীরাত ছওয়াব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবেপ্রতিটি ক্বীরাত হল ওহোদ পর্বতের মতোআর যে ব্যক্তি শুধু তার জানাযা আদায় করে, তারপর দাফন সম্পন্ন হবার পূর্বেই চলে আসে, সে এক ক্বীরাত ছওয়াব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে।[21]
[চলবে]

[1]. ইবনু মানযূর, লিসানুল আরব ৭/২৬; তাজুল আরাস, পৃঃ ৪৪৩৭
[2]. ফীরোযাবাদী, আল-কামূসুল মুহীত্ব, পৃঃ ৭৯৭
[3]. জুরজানী, আত-তারীফাত, পৃঃ ২৮
[4]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালিকীন, ২/৯১ পৃঃ
[5]. আত-তারীফাত, পৃঃ ২৮
[6].
[7]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আত-তিবইয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন, পৃঃ ১৩
[8]. মাদারিজুস সালিকীন ২/৯২
[9]. , ২/৯১-৯২
[10]. ইবনু রজব, জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, ১/১১ পৃঃ
[11]. আত-তারীফাত, পৃঃ ২৮
[12]. মাজমূ ফাতাওয়া ১/৩৩৩
[13]. বুখারী হা/১; মুসলিম হা/১৯০৭; মিশকাত হা/১
[14]. তিরমিযী হা/৩৫৯০; ছহীহুল জামেহা/৫৬৪৮, সনদ হাসান
[15]. বুখারী হা/৬৪৭; মিশকাত হা/৭০২
[16]. বুখারী হা/৩৮; মুসলিম হা/৭৬০; মিশকাত হা/১৯৫৮
[17]. বুখারী হা/২৮৪০; মুসলিম হা/১১৫৩; মিশকাত হা/২০৫৩
[18]. বুখারী হা/৩৭; মুসলিম হা/৭৫৯; মিশকাত হা/১২৯৬
[19]. বুখারী হা/৬৬০; মুসলিম হা/১০৩১; মিশকাত হা/৭০১
[20]. নাসাঈ হা/৩১৩৮; মিশকাত হা/৩৮৫০
[21]. বুখারী হা/৪৭; মিশকাত হা/১৬৫১